প্রকাশিত: ২২/০৪/২০১৮ ৪:৩১ পিএম , আপডেট: ১৭/০৮/২০১৮ ৩:৫১ এএম

উখিয়া নিউজ ডটকম : মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তায় কাজ করছেন ১ হাজার ৬০৯ জন মাঝি। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ছোট-বড় ২৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাতের বেলা দুই শিফটে পাহারা দেওয়ার কাজটি করছেন ‘মাঝি’ পদবির এসব রোহিঙ্গা যুবক ও আরও কিছু স্বেচ্ছাসেবী। ক্যাম্পের ভিতরে চুরি, ডাকাতিসহ নানা অপরাধ ঠেকাতে কাজ করছেন তারা।

এ ছাড়া ত্রাণ বিতরণসহ নানা শৃঙ্খলার কাজেও সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে এসব মাঝি সহযোগিতা করেন। রোহিঙ্গা যুবকদের মধ্য থেকে বাছাই করে কমিউনিটি লিডার হিসেবে তাদের মনোনয়ন করা হয়েছে।

স্থানীয়ভাবে তাদের মাঝি পদবি দেওয়া হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবীর গেঞ্জি পরে, গলায় ‘মাঝি কার্ড’ ঝুলিয়ে তারা দিনরাত নির্ধারিত কাজ করে যান।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা তরুণদের ক্যাম্পের মধ্যেই কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে  স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে তাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি ক্যাম্পে তাদের ভাগ করে দেওয়া হয়। তাদের জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দিতে এবং রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবিলার জন্য তাদের সামাজিক পদ্ধতি অনুসরণ করে এই মাঝিদের কাজে লাগানো হচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন হেড মাঝি, একজন মাঝি ও তার পর সাব-মাঝির পদ রয়েছে।

একজন মাঝির তত্ত্বাবধানে থাকে এক হাজার থেকে ১২০০ রোহিঙ্গা পরিবার। সাব-মাঝির তত্ত্বাবধানে থাকে ১০০ রোহিঙ্গা পরিবার। তাদের লিডার তারাই মনোনয়ন করে থাকেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাঝে মাঝেই লাল পতাকা দেখা যায়। তার মানে সেই পতাকা নির্দেশিত স্থানে একজন মাঝি আছেন।

আর্মি কো-অর্ডিনেশন সেল, উখিয়ার সাবেক চিফ কো-অর্ডিনেটর ও রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে দায়িত্ব পালনকারী লে. কর্নেল শাহ মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের একটা ডাটাবেজ সংরক্ষণ করছি। এই মাঝিদের সিস্টেমটা কাজের সুবিধার্থে গড়ে তুলেছি। রোহিঙ্গাদের প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের রেজিস্ট্রেশন নম্বরসহ তাদের থাকার জায়গারও আলাদা নম্বর দেওয়া আছে। প্রতিটি ব্লক অনুযায়ী মাঝিদের ছবিসহ তালিকা আমরা সংরক্ষণ করছি। তিনি বলেন, এখানকার রোহিঙ্গাদের ম্যানেজ করতে আমাদের পিসকিপিং মিশনসহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে। বাংলাদেশের মিলিটারি এমন ক্রাইসিস প্রায়ই মোকাবিলা করে। আমরা নিজেদের ইনোভেশন দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করেছি।

উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে মারামারি, খুনোখুনি নিত্যদিনের ব্যাপার। এ পর্যন্ত গত আট মাসে ১৫ জন খুন হয়েছেন নিজেদের দ্বন্দ্বে। চুরি, ডাকাতি, অপহরণ তো আছেই। মিয়ানমারের পুরনো বিরোধ তারা এখানে মেটাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কথা কইতে দেরি আছে, কোপ মারতে দেরি নাই। এখন তারা অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ও জড়িয়ে পড়েছে। ক্যাম্পগুলোতে পুলিশের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর একটি উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন আছে।’

উখিয়া সার্কেলের অ্যাডিশনাল এসপি চাইলাই মারমা বলেন, পুরো উখিয়ায় আড়াই লাখ মানুষ। আর একই জায়গায় আরও ১১ লাখ বিদেশিকে রাখতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে ভালো মানুষ যেমন আছে তেমনি চোর, ডাকাত, সমাজবিরোধীও আছে। এত মানুষকে একসঙ্গে রাখা আনেক চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে খাবার বিতরণের দায়িত্ব পালন করে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নন ফুড আইটেমসহ বিভিন্ন কাজে অংশ নিচ্ছে। কাজের সুবিধার্থে সেনাবাহিনীর ২০টিরও বেশি ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট রয়েছে। লে. কর্নেল শাহ মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, ৭টি ক্যাম্পে আমরা মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছি। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন সংগঠন মেডিকেল সেবা দিচ্ছে। আমরা স্যানিটেশনের ওপরও কাজ করেছি।

তিনি বলেন, আমরা প্রায় ৪ হাজার রোহিঙ্গা ভলান্টিয়ার তৈরি করেছি। ভূমিধস, অগ্নিকাণ্ড, সাইক্লোন, ঝড় ইত্যাদি মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় তাদের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মাদক প্রতিরোধ, মানব পাচার বিষয়ে তাদের মোটিভেট করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, সেনাবাহিনী কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের তিনটি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে। এ ছাড়া পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র‌্যাব নিয়মিত পাহারা অব্যাহত রেখেছে। বিকাল ৫টার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাইরের কারও অবস্থানের কোনো সুযোগ নেই। শুধু মেডিকেল ট্রিটমেন্টের প্রয়োজন ছাড়া কোনো রোহিঙ্গা সদস্যেরও বিকাল ৫টার পর ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। স্থানীয়রা বলছেন, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা কঠিন সময় পার করছে। তারপরও তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে চান। কুতুপালং ক্যাম্পে কথা হয় মিয়ানমারের মংডু থানার নাইচাডং এলাকার বাসিন্দা হামিদ হোসেনের সঙ্গে। স্ত্রীসহ ১১ সদস্যের পরিবার তার। ৫ ছেলে, ৪ মেয়ে।

তিনি বলেন, আমরা রাখাইনে ফিরে যেতে চাই। শুধু জানে বাঁচার নিশ্চয়তা পেলেই সেখানে ফিরে যাব। তিনি জানান, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী পাশে না থাকলে তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠত।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর বাংলাদেশ শাখার মুখপাত্র যোশেফ ত্রিপুরা বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের রাখছে সেটা একটা বিশ্ব রেকর্ড। এত দ্রুত সময়ে সরকার ও এ দেশের জনগণ তাদের প্রাণ-মন খুলে সহযোগিতা দিয়েছে। এটা বিশ্বে বিরল।

তিনি বলেন, এত সহজে কোথাও রিফিউজিরা পুনর্বাসনের সুযোগ পায়নি। এখন আমরা তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে কাজ করছি।

পাঠকের মতামত

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যৌথ অভিযান: সন্ত্রাসী জিয়াউর রহমানসহ আটক ১৭

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ আশপাশের বিভিন্ন ব্লকে সমন্বিত এক বিশাল যৌথ অভিযান ...

টেকনাফে জনতার বিক্ষোভের মুখে গণশুনানি পন্ড; কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতা অবরুদ্ধ!

“ইউনিয়ন বিভক্তি হলে আমরণ অনশন করবো” “বর্গকিলোমিটারের অজুহাতে ইউনিয়ন বিভক্তি চাই না” “ইউনিয়ন বিভক্তি হলে ...

কক্সবাজারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা গাইডলাইন অনুমোদন

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা (এলএসবিই) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গাইডলাইন উপস্থাপন ও অনুমোদনবিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত ...

ইয়াবা কারবার, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আতঙ্কে উখিয়া-টেকনাফ

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সংঘবদ্ধ অপরাধ, সশস্ত্র তৎপরতা ও অপহরণ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের ...
Single Page Footer